
‘ওগো বিদেশিনি তোমার চেরি ফুল দাও, আমার শিউলি নাও, এসো দুজনে প্রেমে হই ঋণী’—এই গানটি ছোট-বড় সবাই শোনে থাকবে।
প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিলে সাধারণত চেরি ফুল অতি অল্প সময়ের জন্য ফোটে। যেদেশে চেরি ফুলের জন্ম সে দেশে এই ফুলের উতসবে মাতোয়ারা জাপানীদের সাথে সাথে সবাই।
চেরি ফুল উতসব বা হানামি বলা হয়ে থাকে। যে পার্কে এই ফুলের উতসব হয় সেখানটা হচ্ছে ওয়েনু পার্ক। এই পার্কে সব বয়সী মানুষের ভিড়। সপরিবারে অথবা বন্ধুবান্ধব মিলে খাবার, ড্রিংকস নিয়ে চেরি গাছের নিচে মাদুর বিছিয়ে বসে গল্প করছে, কেউ গান গাইছে, কেউবা কার্ড খেলছে, কেউ আবার ঘুমাচ্ছে। এ যেন অন্য রকম এক উন্মাদনা।
প্রায় ১৩ শ বছর ধরে জাপানিরা এই ফুলটিকে নিয়ে বিভিন্ন উৎসব পালন করে আসছে, যার মধ্যে ‘হানামি’ অন্যতম। হানামি জাপানি শব্দ, এর অর্থ ফুল দেখা বা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করা। অনিন্দ্য সুন্দর এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে জাপানিরা এ উৎসবের আয়োজন করে। উৎসবের দিনটি জাপানিদের কাছে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। তাদের সাথে যোগ দেয় বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বা জাপানে বসবাসরত বিদেশিরাও।
যা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর! অন্যদিকে পার্কের মাঠে মেলার মতো স্টল নানা রকমের খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছে এবং যার যেটা পছন্দ কিনে খাচ্ছে। চেরিকে নিয়ে সারা বিশ্বেই চলে ব্যাপক উন্মাদনা। নিজেদের জাতীয় ফুল বলে জাপান এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। প্রায় ১৩ শ বছর ধরে জাপানিরা এই ফুলটিকে নিয়ে বিভিন্ন উৎসব পালন করে আসছে, যার মধ্যে ‘হানামি’ অন্যতম। হানামি জাপানি শব্দ, এর অর্থ ফুল দেখা বা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করা। অনিন্দ্য সুন্দর এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে জাপানিরা এ উৎসবের আয়োজন করে। উৎসবের দিনটি জাপানিদের কাছে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।সাধারণ ভাষায় যা চেরি গাছের নিচে বসে পিকনিক করা আর চেরির সৌন্দর্য উপভোগ করা।
জাপানের জনপ্রিয় হানামির ইতিহাস এক হাজার বছরের বেশি। ওই সময়কার মানুষ বিশ্বাস করত, ঈশ্বরের অবস্থান উদ্ভিদের ভেতর। আর সে বিশ্বাস থেকেই তারা গাছের পূজা করত ও চেরি গাছের কাছে মানত রাখত। জাপানিরা চেরির এই সৌন্দর্য উপভোগের জন্য চেরি গাছের নিচে সারা দিন অবস্থান করেন, পছন্দের আহার পানীয় গ্রহণের পাশাপাশি তারা চেরির অপরূপ শোভা অবলোকন করেন। হয়তো ভাবছেন, গাছের নিচে বসে সৌন্দর্য দেখার কী মানে হয়? এর কারণ হলো—চেরির সৌন্দর্য অল্প কয়েক দিনের, তিন-চার দিনের মাথায় পাপড়িগুলো ঝরে পড়ে। মানব জীবন ক্ষণস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী মানবজীবনে সব সময় সুন্দর থাকার চেষ্টা করা, এই দর্শন জাপানিরা নাকি চেরির কাছ থেকেই পেয়েছেন। জাপানের সাহিত্য কর্মে প্রাণবন্ত জীবনের প্রতীক রূপে চেরিকে তুলে ধরা হয়।
প্রায় তিন শ বছর আগে টোকিও শহর নতুন করে নির্মাণের সময় সুপরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছিল অসংখ্য চেরি গাছ। গড়ে তোলা হয়েছিল চেরি উদ্যান। অতি যত্ন করে লাগানো গাছগুলো প্রতি বসন্তে শোভা ছড়িয়ে প্রতিদান দিয়ে চলছে। নদীর কিনার ঘেঁষে রোপিত চেরি গাছগুলোর পুষ্পশোভিত শাখাপ্রশাখা প্রবহমান জলের মধ্যে তৈরি করছে প্রতিবিম্ব। আজকের এই আধুনিক উন্নত জাপান তো তিন শ বছর আগে ছিল না, কিন্তু সুন্দরের প্রতি ভালোবাসা, সুন্দরকে লালন করা, নিজের সত্তার মধ্যে ধারণ করা এই বোধটুকু তখনো ছিল, আর এটাই জাপানিদের সহজাত বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয়।
সাকুরা বা চেরি উৎসব এখন জাপান ছাড়াও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে পালিত হয়। দেশগুলো হচ্ছে—তাইওয়ান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ম্যাকাও, জর্জিয়া, ফিনল্যান্ড ও আমেরিকা। শত বছর আগে ১৯১২ সালে শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে জাপানিরা আমেরিকাকে ৩০০০ সাকুরা গাছের চারা উপহার দেয়। এরপর ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে গাছগুলো শোভা পেতে থাকে। ১৯৬৫ সালে আরও ৩৮০০ চারা উপহার হিসেবে পাঠানো হয় জাপানের পক্ষ থেকে। ফলে এটি এখন আমেরিকানদের কাছেও বেশ মোহনীয় একটি ফুল। নিউইয়র্কের ব্রুকলিতে প্রতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি সাকুরা ফেস্টিভ্যাল পালিত হয়।
০২ এপ্রিল, ২০১৮/ টোকিও/ আব্দুল্লাহ আল মামুন
