Site icon দ্বিপ্রহর ডট কম

কানাডার কুইবেকে ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় পোশাক

কানাডার কুইবেকে ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় পোশাক

কর্মক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীরা যাতে ধর্মীয় বিষয়টি তুলে ধরার মতো পোশাক না পরতে পারেন, এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করার তোড়জোড় চলছে কানাডার কুইবেক প্রদেশে। বিষয়টি এখন প্রস্তাব আকারে আছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মূলত হিজাব ও নিকাব পরা মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করেই মার্চের শেষ দিকে আইনসভায় এই বিতর্কিত বিল উপস্থাপন করা হয়েছে।

কুইবেক মূলত ফরাসি ভাষাভাষী মানুষের শহর। প্রদেশটির আইনসভার স্পিকারের চেয়ারের ওপর ঝুলছে বিশাল ক্রুশবিদ্ধ একটি যিশুমূর্তি। ১৯৩৬ সালে প্রথমবারের মতো ঝোলানো এ মূর্তি ক্যাথলিক গির্জার সঙ্গে কুইবেক সরকারকে এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে দিয়েছে।

১৯৬০ সালে জনজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ওপর গির্জার নজরদারির বিরুদ্ধে ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’ করে জনতা। সেবার আন্দোলন সামলে নিয়েছিল এই প্রতীকী মূর্তি। তখন থেকে প্রদেশটির স্কুল, হাসপাতাল ও সামাজিক অনুষ্ঠান পরিচালনার অধিকার হারায় গির্জা। তবে কোনো রাজনীতিবিদই আইনসভা থেকে যিশুমূর্তি সরিয়ে ফেলার পক্ষে ছিলেন না; বরং ১৯৮২ সালে পুরোনো মূর্তিটি সরিয়ে নতুন আরেকটি মূর্তি বসানো হয়।

আগের মূর্তিটি নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলছিলেন কুইবেকের প্রধান এক নেতা। শেষ পর্যন্ত মূর্তিবিষয়ক এক সিদ্ধান্তে এসেছে জাতীয় পরিষদ (কুইবেকের আইনসভা)। সর্বসম্মত এক ভোটে তাঁরা মেহগনি, ব্রোঞ্জ ও ইস্পাত নির্মিত মূর্তিটি ভবনের তুলনামূলক কম চোখে পড়বে—এমন স্থানে সরিয়ে নিতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে যে আইন পাস করতে হবে, তা আরও ঝামেলাপূর্ণ। ফ্রাঁসোয়া লেগোর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী প্রাদেশিক সরকারের দাবি, সদ্য নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা, আইনজীবী, বিচারকসহ সরকারি চাকরিজীবীরা কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতীকবাহী কোনো পোশাক পরতে পারবেন না। এ আইন প্রণীত হলে এমন ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপে উত্তর আমেরিকার প্রথম কোনো প্রদেশ হবে কুইবেক।

ফ্রাঁসোয়া লেগো আইনে এমন একটি বিধান চান, যাতে ‘লাইসিতে’ বা ধর্মনিরপেক্ষতার আপসহীন এক সংস্করণ চালু হয়। এই ধারণার মূল কথা নাগরিকদের ধর্মীয় জীবনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাষ্ট্রের থাকবে না। এমনকি রাষ্ট্র নিজেও সম্পূর্ণভাবে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে। সমালোচকেরা লেগোর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেছেন, তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিমদের হেয় করার জঘন্য এক এজেন্ডা হাতে নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, যিশুমূর্তি সরিয়ে ফেলা নিছকই এক নাটক।

বিল ২১ নামে পরিচিত এই প্রস্তাব কুইবেকের সবচেয়ে বড় এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ শহর মন্ট্রিলকে অন্যান্য প্রদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। হাজারো মানুষ এর বিরোধিতা করছে। কসমোপলিটন শহর কালগারির মুসলিম মেয়র নাহিদ নেনশি পোশাকে নিষেধাজ্ঞা আরোপকে ‘নির্বুদ্ধিতা’ বলে অভিহিত করেছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, এই আইন পাস হলে ধর্মীয় বৈষম্য বৈধতা পাবে। তবে লেগোর দল কোয়ালিশন অ্যাভেনির কুইবেক (কুইবেকের ভবিষ্যৎ জোট) এই আইন পাসে ভোট দিয়েছে।

২০১১ সালে কুইবেকের প্রায় ৭ দশমিক ৫ লাখ অধিবাসীর মধ্যে মুসলমান ছিল ৩ শতাংশ। ১০ বছর আগে এই হার ছিল অর্ধেক। মন্ট্রিলের ম্যাকগিল ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব কানাডার পরিচালক ড্যানিয়েল বি ল্যান্ড এ ধরনের পরিবর্তনকে ‘বিশাল স্থানান্তর’ বলে দাবি করেছেন। আইনপ্রণেতারা ‘সার্বভৌমত্বের ওপর নজর দেওয়া বন্ধ করে ধর্মীয় সমঝোতা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত বিষয়াদির’ ওপর গুরুত্ব দেন।

১৮৪৪ সালে লন্ডনে ওয়াইএমসিএ নামে একটি কল্যাণ আন্দোলন শুরু হয়, সারা বিশ্বে যার শাখা ছড়িয়ে আছে। ২০০৬ সালে তাদের একটি শাখা সিনাগগগামীদের (ইহুদিদের ধর্মীয় উপাসনালয়) সন্তুষ্ট করতে কর্মক্ষেত্রে যাঁরা আঁটো পোশাক পরে আসেন, তাঁদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এ ধরনের আরও বেশি কিছু বিতর্কের জের ধরে প্রদেশটির লিবারেল নেতা জেইন চ্যারেস্ট কুইবেকে দুজন গবেষক নিয়োগ করতে উৎসাহী হন। কুইবেক কীভাবে ‘সংখ্যালঘুদের জন্য বন্ধুবৎসল’ হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা করেন তাঁরা।

তাঁরা জানান, কুইবেকের সাংস্কৃতিক পরিচয় বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই ভিত্তিহীন। তবে পুলিশের মতো যেসব সরকারি কর্মচারী ‘জোরপূর্বক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার অধিকারী’, তাঁদের পোশাকে ধর্মীয় প্রতীকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই শ্রেয় বলে মনে করেন গবেষকেরা। আইনসভার কক্ষ থেকে যিশুমূর্তি অপসারণের প্রস্তাবও তাঁরাই দেন।

২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধান নেতা ও লিবারেলের সদস্য ফিলিপ কিউলার্ড নতুন এক আইন জারি করেন। এই আইন অনুযায়ী সরকারি চাকরিপ্রার্থী বা চাকরিজীবীদের মুখ ঢাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। মোদ্দা কথা, মুসলিম নারীদের নেকাব পরা নিষিদ্ধ করা হয় এ আইনের মাধ্যমে। আইনসভায় পাস হলেও কুইবেক আদালতের বিচারকেরা এই আইন স্থগিত করেন। এক বিচারক বলেন, এর কারণে মুসলিম নারীদের ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হতে পারে।

ফিলিপ কিউলার্ডের নিষেধাজ্ঞার মতো বিল ২১ও সরকারি চাকুরেদের মুখ ঢাকার অনুমতি দেবে না। বর্তমান কর্মীরা ধর্মীয় পোশাক চালিয়ে যেতে পারবেন, তবে কেবল চাকরি পরিবর্তন না করা পর্যন্ত এই অনুমতি বলবৎ থাকবে। লেগো তো শিক্ষানবিশ শিক্ষকদের বলেই দিয়েছেন, কারও যদি ধর্মীয় পোশাক পরার ইচ্ছা থাকে, তাহলে তিনি অন্য কোনো পেশা বেছে নিতে পারেন।

এই নিষেধাজ্ঞা কীভাবে কাজ করবে, তা বোঝাতে গিয়ে বেশ নাজেহাল হতে হয়েছে সরকারকে। জননিরাপত্তামন্ত্রী বলেন, পুলিশ কর্মকর্তারা জনগণকে আইন মানতে বাধ্য করতে পারেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এ কথা প্রত্যাখ্যান করেন। অভিবাসনমন্ত্রী সাইমন জোলিন বারাত বলেন, বিল ২১ শুধু সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, ‘যেখানে কোনো কিছু স্বাভাবিক বলে মনে হবে না’। তাহলে ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিত গয়নার কী হবে? সাইমন অবশ্য ওয়াদা করেছেন, এ বিষয়ে কোনো ‘চিরুনি তল্লাশি’ চালানো হবে না।

ইয়ারমুলক (বিশেষ টুপি) পরিহিত ইহুদি এবং পাগড়ি বাঁধা শিখরাও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।

মন্ট্রিলের সেন্টার ফর ইসরায়েল অ্যান্ড জিউশ অ্যাফেয়ার্সের গবেষণা বিভাগের প্রধান ডেভিড ওয়ালেটের মতে, এই বিলের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, এটি কারও ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়।’

কুইবেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক কার্যক্রম ক্রমেই বাড়ছে। ২০১৭ সালে পুলিশের কাছে ১১৭টি অপরাধের নথি দায়ের করা হয়। এ বছর এক শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী প্রদেশটির রাজধানী কুইবেক সিটিতে মসজিদে নামাজ পড়া অবস্থায় ছয়জনকে হত্যা করে। জেইন চ্যারেস্টের প্রতিবেদনের অন্যতম এক লেখক চার্লস টেইলর লেগো সরকারের নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন, মুসলিমদের মধ্যে ‘কোনো একটা সমস্যা আছে’—এই ধারণা লেগো সরকারই ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে প্রধান এই নেতার। তাঁর বিলের মাধ্যমে কানাডার সংবিধানে ‘তথাপি ধারা’ আহ্বান করা হয়েছে। এর ফলে আঞ্চলিক সরকার সংবিধানে নাগরিকদের জন্য সুনিশ্চিত কিছু সুবিধা অগ্রাহ্য করতে পারবেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা যার মধ্যে অন্যতম।

বি ল্যান্ড বলেন, সরকার যদি মনে করে, এই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা সহজ হবে, তবে তা ‘হাস্যকর’। আইনজীবীরা খতিয়ে দেখছেন এর মাধ্যমে নারী-পুরুষনির্বিশেষে কারও সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না। তথাপি ধারার মাধ্যমে কারও অধিকার যেন খর্ব না হয়, সেটিই তাঁদের বিবেচ্য বিষয়।

এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে ধীরে ধীরে ধর্মীয় প্রতীককেন্দ্রিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়ে যাবে। এরপর হয়তো কুইবেকাররা বুঝতে পারবে, সরকার আদৌ ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কি না। যদি স্পিকারের চেয়ারের ওপর যিশুমূর্তি ঝুলতে থাকে, তাহলে উত্তরটা হবে ‘না’।

Exit mobile version