AI কি আমাদের চাকরি কেড়ে নেবে? নাকি তৈরি করবে নতুন সম্ভাবনা?
একটা প্রবাদ আছে—“নদীর এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা।”
প্রযুক্তি আর কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনটাও অনেকটা নদীর এই ভাঙাগড়ার মতো। এক ধরনের কাজ হারিয়ে যায়, আবার সেই জায়গায় তৈরি হয় নতুন ধরনের কাজের সুযোগ।
একটা সময় ছিল, যখন ব্যাংকের সমস্ত হিসাব-নিকাশ হতো খাতা-কলমে। বিশাল বিশাল লেজার বইয়ে প্রতিটি লেনদেন লিখে রাখতে হতো। এসব কাজের জন্য প্রচুর লোকবলের প্রয়োজন ছিল।
এরপর এলো ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার। ধীরে ধীরে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ডিজিটাল হতে শুরু করল। যে কাজ করতে আগে কয়েকজন মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, সেই কাজ কম্পিউটারের মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই করা সম্ভব হলো।
ফলে হাতে হিসাব লেখা কিংবা লেজার সংরক্ষণের মতো অনেক কাজের চাহিদা কমে গেল। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি হলো নতুন কর্মক্ষেত্র—কম্পিউটার অপারেটর, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটাবেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার, সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞসহ আরও কত কী!
অর্থাৎ প্রযুক্তি শুধু কাজ কেড়ে নেয়নি, কাজের ধরনও বদলে দিয়েছে।
আমি নিজে দীর্ঘদিন ধরে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। এই সময়ে প্রযুক্তির অনেক পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেছি।
একটা সময় ছিল, যখন প্রোগ্রামারদের অনেক কাজই সাধারণ টেক্সট এডিটর কিংবা কমান্ড লাইন ব্যবহার করে করতে হতো। কোড লেখা, ডিবাগিং, ভুল খুঁজে বের করা—সবকিছুতেই প্রচুর সময় ও পরিশ্রম লাগত।
এরপর ধীরে ধীরে আসতে শুরু করল উন্নত সব ডেভেলপমেন্ট টুল।
যারা অনেক দিন ধরে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট করছেন, তাদের অনেকেই নিশ্চয়ই Dreamweaver ব্যবহার করেছেন। সেই সময়ে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছিল টুলটি।
এরপর এলো আরও আধুনিক IDE। যেমন, PHP ডেভেলপারদের জন্য PhpStorm।
কোড নেভিগেশন, রিফ্যাক্টরিং, ডিবাগিং, অটোকমপ্লিশন, কোড ইন্সপেকশন—কত কিছুই না সহজ হয়ে গেল!
কিন্তু এসব টুল আসার কারণে কি প্রোগ্রামারদের প্রয়োজন শেষ হয়ে গিয়েছিল?
না। বরং একজন প্রোগ্রামার আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে, অনেক কম সময়ে জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারছিলেন।
আমার কাছে AI হলো একজন অত্যন্ত দক্ষ সহকারী, যে আমার কাজের গতি ও সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
একটা বাস্তব উদাহরণ দিই।
আগে যখন টিমের অন্য ডেভেলপারদের কোড রিভিউ করতাম, তখন অনেক সময় ব্যয় করতে হতো ছোটখাটো বিষয় নিয়ে।
কখনো বলতে হতো—
অনেক সময় ডেভেলপাররা ঠিকমতো টেস্ট কেসও লিখতে পারতেন না। ফলে একই বিষয় নিয়ে বারবার আলোচনা করতে হতো।
এখন AI এসব কাজের অনেকটাই প্রাথমিকভাবে করে দিতে পারে।
কোডের সম্ভাব্য সমস্যা শনাক্ত করা, রিফ্যাক্টরিংয়ের পরামর্শ দেওয়া, টেস্ট কেস তৈরি করা, কোডের ব্যাখ্যা দেওয়া—সবকিছুই অনেক দ্রুত হচ্ছে।
ফলে আমাকে আর প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আগের মতো সময় ব্যয় করতে হয় না। বরং বেশি মনোযোগ দিতে পারি সফটওয়্যারের আর্কিটেকচার, বিজনেস লজিক, সিকিউরিটি, পারফরম্যান্স এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর দিকে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে AI-এর লেখা কোড অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যায়। AI-ও ভুল করে। কখনো এমন কোড তৈরি করে, যা দেখতে ঠিকঠাক হলেও বাস্তবে ভুল বা অনিরাপদ।
তাই AI কাজের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু কাজের দায়িত্ব ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আমাদেরই নিতে হয়।
আমার মনে হয়, প্রশ্নটা একটু অন্যভাবে করা উচিত।
AI-এর কারণে কোন ধরনের কাজের চাহিদা কমবে, আর কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়বে?
বাস্তবতা হলো, কিছু কাজ অবশ্যই কমে যাবে। বিশেষ করে যেসব কাজ বারবার একই নিয়মে করতে হয়, কিংবা খুব বেশি বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই সম্পন্ন করা যায়।
যারা শুধু অল্প কিছু কোড লিখতে পারেন, কিন্তু সফটওয়্যার কীভাবে কাজ করে, কেন কাজ করে কিংবা কোনো সমস্যার সঠিক সমাধান কীভাবে করতে হয়—এসব বোঝেন না, তাদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে।
বিশেষ করে নতুনদের জন্য চ্যালেঞ্জটা বেশি। কারণ আগে যেসব ছোটখাটো কাজ দিয়ে একজন জুনিয়র ডেভেলপার ক্যারিয়ার শুরু করতেন, সেগুলোর অনেকটাই এখন AI দিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে এটাও সত্য, AI ব্যবহার করতে পারা আর একজন দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া এক জিনিস নয়।
কোড তৈরি করা আর একটি নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য সফটওয়্যার তৈরি করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।
এখনো পৃথিবীর অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি।
আগামী দিনে আরও অনেক কিছু ডিজিটাল হবে। AI-এর কারণে যেসব সফটওয়্যার তৈরি করা আগে ব্যয়বহুল বা সময়সাপেক্ষ ছিল, সেগুলো তৈরি করাও তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
আর ডিজিটাল সিস্টেম যত বাড়বে, তত বাড়বে ডেটা ম্যানেজমেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি, প্রাইভেসি, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, অটোমেশন এবং AI-নির্ভর সিস্টেমের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন।
নতুন কাজ তৈরি হবে, তবে সব হারিয়ে যাওয়া কাজের সমপরিমাণ নতুন চাকরি যে তৈরি হবেই, এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবর্তনের এই সময়ে অনেক মানুষকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হতে পারে।
ইতিহাসের দিকে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়।
একটা সময় মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি কিংবা অন্যান্য পশুচালিত যানবাহন।
মোটরগাড়ি আসার পর সেই পেশাগুলোর অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু তৈরি হয়েছে গাড়ি নির্মাণ, মেরামত, পরিবহন, যন্ত্রাংশ উৎপাদনসহ অসংখ্য নতুন পেশা।
প্রযুক্তির প্রতিটি বড় পরিবর্তনই আমাদের নতুনভাবে কাজ করতে শিখিয়েছে।
আমার পরামর্শ খুব সহজ।
প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে বদলাতে শিখুন।
শুধু AI দিয়ে কীভাবে কোড লিখতে হয়, সেটুকু শিখলেই হবে না। বুঝতে হবে AI কীভাবে কাজ করে, কোথায় ভুল করতে পারে এবং কীভাবে এর তৈরি ফলাফল যাচাই করতে হয়।
নিজের মূল দক্ষতা আরও শক্তিশালী করুন। সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ান। নতুন প্রযুক্তি শিখুন। শেখার অভ্যাসটা ধরে রাখুন।
বিশেষ করে যারা সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে আছেন, তাদের জন্য আমার কথা হলো—
শুধু কোড লেখার দক্ষতার ওপর নির্ভর না করে, সমস্যার সমাধান করতে পারার দক্ষতা তৈরি করুন।
কারণ কোড লেখার পদ্ধতি বদলাতে পারে, টুল বদলাতে পারে, প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজও বদলাতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান করার প্রয়োজন সহজে শেষ হবে না।
নদীর এক কূল ভাঙবে, অন্য কূল গড়বে—এটাই পরিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়ম।
আমাদের কাজ হলো ভাঙনের ভয়ে বসে না থেকে নতুন সম্ভাবনার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা।
ভয় নয়, দক্ষতা বাড়ান।
প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে শিখুন।
শেখা বন্ধ করবেন না, নিজেকে আপডেট রাখুন।
কারণ আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে শুধু আপনি কতটুকু জানেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হবে না—নতুন কিছু কত দ্রুত শিখতে এবং বাস্তবে কাজে লাগাতে পারেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মূল লেখা: AI কি আমাদের চাকরি কেড়ে নেবে? নাকি তৈরি করবে নতুন সম্ভাবনা?